Table of Contents
স্ত্রী কর্তৃক স্বামীকে তালাক, আজকে আমরা এই বিষয়ে আলোচনা করব।
শুধু মুখে তালাক বললেই তালাক কার্যকর হয়ে যায় না। আইন অনুযায়ী নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক।
বাংলাদেশের মুসলিম আইনে একজন নারীর জন্য প্রধানত চারটি উপায়ে বিবাহ বিচ্ছেদের সুযোগ রয়েছে:
১. তালাক-ই-তাওফিজ
২. খুলা তালাক
৩. মুবারাত
৪. আদালতের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদ
এখন চলুন একে একে প্রতিটি পদ্ধতি সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।
প্রথমত, তালাক-ই-তাওফিজ।
এটি এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে স্বামী পূর্বেই স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার ক্ষমতা প্রদান করে রাখেন। সাধারণত এই ক্ষমতা কাবিননামার মাধ্যমে দেওয়া হয়।
বিয়ের সময় কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামে সাধারণত উল্লেখ থাকে, স্বামী কি স্ত্রীকে তালাক প্রদানের ক্ষমতা অর্পণ করেছেন কি না।
যদি সেখানে “হ্যাঁ” লেখা থাকে, তাহলে স্ত্রী স্বামীর অর্পিত ক্ষমতাবলে তালাক প্রদান করতে পারেন।
এই ব্যবস্থাকে বলা হয় “তালাক-ই-তাওফিজ”।
স্ত্রী তালাক ঘোষণা করার পর তাকে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র অথবা সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের নিকট লিখিত নোটিশ পাঠাতে হবে।
একই সঙ্গে নোটিশের একটি কপি স্বামীকেও প্রদান করতে হবে।
রেজিস্টার্ড ডাক (এ/ডি সহ) নোটিশ পাঠাতে হবে।
দ্বিতীয়ত, খুলা তালাক।
খুলা তালাক হলো এমন এক ধরনের বিবাহ বিচ্ছেদ যেখানে তালাকের উদ্যোগ স্ত্রী গ্রহণ করেন এবং স্বামী তাতে সম্মতি প্রদান করেন।
অর্থাৎ স্ত্রী বিবাহ বিচ্ছেদ চান, স্বামী তাতে সম্মত হন এবং উভয় পক্ষ একটি সমঝোতায় পৌঁছান।
অনেক ক্ষেত্রে স্ত্রী দেনমোহরের সম্পূর্ণ বা আংশিক দাবি ত্যাগ করে খুলা তালাক গ্রহণ করেন। তবে এটি বাধ্যতামূলক নয়। বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে উভয় পক্ষের পারস্পরিক সমঝোতার ওপর নির্ভর করে।
তৃতীয়ত, মুবারাত।
মুবারাত হলো পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে বিবাহ বিচ্ছেদ।
এক্ষেত্রে স্বামী ও স্ত্রী উভয়েই বিবাহ বন্ধন শেষ করতে সম্মত হন এবং সমঝোতার মাধ্যমে বৈবাহিক সম্পর্কের ইতি ঘটে।
চতুর্থত, আদালতের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদ।
যদি স্ত্রী তালাক-ই-তাওফিজ, খুলা বা মুবারাতের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদ করতে না পারেন, তাহলে তিনি আদালতের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন করতে পারবেন।
এক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন হলো মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন, ১৯৩৯।
এই আইনের অধীনে স্ত্রী বিভিন্ন কারণে আদালতে বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা করতে পারেন।
এখন জেনে নেওয়া যাক আদালতের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদের প্রধান কারণসমূহ।
প্রথম কারণ—স্বামী চার বছর নিরুদ্দেশ থাকলে।
যদি টানা চার বছর ধরে স্বামীর কোনো খোঁজ না পাওয়া যায়, তাহলে স্ত্রী আদালতে বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন করতে পারেন।
দ্বিতীয় কারণ—দুই বছর ভরণপোষণ না দেওয়া।
স্বামী যদি ধারাবাহিকভাবে দুই বছর স্ত্রীকে ভরণপোষণ না দেন, তাহলে স্ত্রী আদালতের শরণাপন্ন হতে পারেন।
তৃতীয় কারণ—স্বামীর আইনবহির্ভূত দ্বিতীয় বিবাহ বা একাধিক স্ত্রীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ।
এ ধরনের বিষয় আদালতে বিবাহ বিচ্ছেদের প্রাসঙ্গিক কারণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
চতুর্থ কারণ—স্বামী সাত বছর বা তার বেশি মেয়াদের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে।
পঞ্চম কারণ—যৌক্তিক কারণ ছাড়া তিন বছর বৈবাহিক দায়িত্ব পালন না করা।
ষষ্ঠ কারণ—বিয়ের সময় থেকে মামলা দায়েরের সময় পর্যন্ত স্বামীর পুরুষত্বহীনতা বিদ্যমান থাকলে।
সপ্তম কারণ—দীর্ঘদিন মানসিক রোগে আক্রান্ত থাকা অথবা কুষ্ঠরোগ কিংবা গুরুতর যৌনরোগে আক্রান্ত থাকা।
অষ্টম কারণ—নাবালিকা অবস্থায় বিয়ে।
যদি কোনো মেয়েকে তার পিতা বা অভিভাবক ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার পূর্বে বিয়ে দিয়ে থাকেন এবং তিনি ১৮ বছর হওয়ার পূর্বে সেই বিবাহ প্রত্যাখ্যান করেন, তাহলে তিনি আদালতের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন করতে পারেন।
নবম কারণ—নিষ্ঠুর আচরণ।
যেমন—
শারীরিক নির্যাতন,
মানসিক নির্যাতন,
অবৈধ সম্পর্ক,
অনৈতিক কাজে বাধ্য করা,
সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করা,
ধর্মীয় স্বাধীনতায় বাধা দেওয়া,
অথবা একাধিক স্ত্রীর মধ্যে বৈষম্যমূলক আচরণ করা।
এ ধরনের আচরণ আদালতে বিবাহ বিচ্ছেদের যথেষ্ট কারণ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
আদালতের প্রক্রিয়া কী?
আদালতে মামলা দায়েরের পর স্ত্রী যদি তার অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হন, তাহলে আদালত বিবাহ বিচ্ছেদের ডিক্রি প্রদান করেন।
পরবর্তীতে আদালত সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যানের নিকট ডিক্রির সত্যায়িত কপি প্রেরণ করেন এবং সেই কপিকে তালাকের নোটিশ হিসেবে গণ্য করা হয়।
এখন প্রশ্ন হলো—তালাক কার্যকর হতে কত সময় লাগে?
বাংলাদেশের আইনে চেয়ারম্যানের নিকট নোটিশ প্রেরণের তারিখ থেকে ৯০ দিন অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত তালাক কার্যকর হয় না।
এই সময়ের মধ্যে সালিশি পরিষদ গঠন করে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পুনর্মিলনের চেষ্টা করা হয়।
যদি পুনর্মিলন না ঘটে, তাহলে ৯০ দিন পূর্ণ হওয়ার পর তালাক কার্যকর হয়ে যায়।
তবে তালাক ঘোষণার সময় স্ত্রী যদি অন্তঃসত্ত্বা থাকেন, তাহলে ৯০ দিন অথবা সন্তান জন্ম হওয়ার সময়—এই দুইয়ের মধ্যে যেটি বেশি সময় লাগে, সেই সময় অতিবাহিত হওয়ার পর তালাক কার্যকর হবে।
নোটিশ না দিলে কী হবে?
অনেকেই মনে করেন, শুধু তালাকনামা লিখলেই সব শেষ।
কিন্তু বাস্তবে চেয়ারম্যানের নিকট নোটিশ প্রদান আইনত বাধ্যতামূলক।
এই বিধান লঙ্ঘন করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড, অথবা ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।{The Muslim Family Laws Ordinance, 1961- Section 7(2)}
এখন আসি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে—
স্ত্রী বিবাহ বিচ্ছেদ করলে কি দেনমোহর পাবেন?
সাধারণভাবে উত্তর হলো—হ্যাঁ।
দেনমোহর স্ত্রীর আইনগত অধিকার এবং এটি বিবাহের সঙ্গে সম্পর্কিত, তালাকের সঙ্গে নয়।
তাই সাধারণ অবস্থায় স্বামী দেনমোহর পরিশোধের দায় থেকে মুক্ত হন না।
তবে খুলা তালাকের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে স্ত্রী দেনমোহরের সম্পূর্ণ বা আংশিক দাবি ত্যাগ করতে পারেন।
এ ছাড়া তালাক কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত স্ত্রী আইন অনুযায়ী ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকারী থাকেন।
বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য সাধারণত যেসব কাগজপত্র প্রয়োজন হয়—
কাবিননামা বা বিবাহ নিবন্ধন সনদ,
স্বামী-স্ত্রীর জাতীয় পরিচয়পত্র
সবশেষে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখবেন—
শুধু মুখে তিনবার তালাক বললেই আইনগতভাবে তালাক কার্যকর হয় না।
আবার কাগজে লিখে দিলেই সঙ্গে সঙ্গে তালাক সম্পন্ন হয়ে যায় না।
বাংলাদেশের আইনে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই তালাক কার্যকর করতে হয়।
মো: আশরাফুল ফারুক চৌধুরী
অ্যাডভোকেট
জেলা ও দায়রা জজ আদালত, চট্টগ্রাম।
ফোন: 01672-536940

